ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের আবেগ বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কিন্তু কেপ ভার্দে-কুরাসাওয়ের মতো ছোট দেশ এগিয়ে গেলেও কেন পিছিয়ে লাল-সবুজ? জানা যাক বাস্তব কারণ।
কেপ ভার্দে-কুরাসাও যদি পারে, বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে? ফুটবলের স্বপ্নে কোথায় আটকে লাল-সবুজ
ফিফা বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের চিত্র বদলে যায়। দেশের অলিগলি থেকে শুরু করে শহরের বড় সড়ক—সবখানে দেখা যায় ফুটবলের উন্মাদনা। কোথাও ব্রাজিলের পতাকা, কোথাও আর্জেন্টিনার জার্সি, আবার কোথাও বিশ্বসেরা তারকাদের নিয়ে আলোচনা। লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা নেইমারের খেলা দেখতে রাত জেগে বসে থাকে কোটি ফুটবলপ্রেমী।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষও অবাক হয়ে দেখে বাংলাদেশের মানুষের এই ফুটবল ভালোবাসা। কিন্তু বিশ্বকাপের আলোচনার বাইরে গেলেই সামনে আসে ভিন্ন এক বাস্তবতা। যে দেশে ফুটবল নিয়ে এত আবেগ, সেই দেশই এখনো নিজেদের জাতীয় দলকে বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে দেখতে পারেনি।
শুধু বিশ্বকাপ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপেও দীর্ঘদিন ধরে সাফল্যের দেখা নেই বাংলাদেশের। ২০০৩ সালের পর আর শিরোপা ঘরে তুলতে পারেনি লাল-সবুজের দল। এক সময়ের জনপ্রিয় এই খেলাটি ধীরে ধীরে দর্শক হারিয়েছে, মাঠ থেকেও কমেছে মানুষের উপস্থিতি।
একসময় ফুটবল ছিল দেশের সবচেয়ে বড় উন্মাদনা
বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাস অবশ্য এমন হতাশার ছিল না। স্বাধীনতার পর থেকে আশির দশক পর্যন্ত দেশের ফুটবল ছিল মানুষের অন্যতম প্রধান বিনোদন। ঢাকা লিগে আবাহনী ও মোহামেডানের লড়াই মানেই ছিল অন্যরকম উত্তেজনা।
মাঠে হাজার হাজার দর্শকের ভিড়, ক্লাব সমর্থকদের উন্মাদনা আর খেলোয়াড়দের জনপ্রিয়তা ফুটবলকে নিয়ে গিয়েছিল অন্য উচ্চতায়। শুধু আবাহনী-মোহামেডান নয়, ভিক্টোরিয়া, ওয়ান্ডার্স, ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো ক্লাবগুলোর খেলাও ছিল দর্শকদের কাছে বড় আকর্ষণ।
সেই সময় বাংলাদেশের ফুটবলে উঠে এসেছিলেন কাজী সালাউদ্দিন, মোনেম মুন্না, আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু, শেখ মোহাম্মদ আসলাম ও বাদল রায়ের মতো তারকারা। জাতীয় দলও দক্ষিণ এশিয়ায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল।
ছোট দেশ হয়েও এগিয়ে যাচ্ছে কেপ ভার্দে-কুরাসাও
বর্তমান ফুটবল বিশ্বে ছোট দেশগুলোও বড় চমক দেখাচ্ছে। কেপ ভার্দে কিংবা কুরাসাওয়ের মতো দেশগুলো সীমিত জনসংখ্যা নিয়েও আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।
কেপ ভার্দের জনসংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। দেশটির আয়তনও বাংলাদেশের তুলনায় খুবই ছোট। একইভাবে কুরাসাও ছোট একটি দ্বীপ অঞ্চল। কিন্তু পরিকল্পিত উন্নয়ন, অবকাঠামো তৈরি এবং ফুটবলের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগ তাদের এগিয়ে নিয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি, আয়তনও অনেক বেশি। তারপরও ফিফা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে?
তৃণমূল পর্যায়ে দুর্বলতাই বড় সমস্যা
সাবেক জাতীয় ফুটবলার শেখ মোহাম্মদ আসলামের মতে, বাংলাদেশের মূল সমস্যা প্রতিভার অভাব নয়, বরং সঠিকভাবে প্রতিভা তৈরি করতে না পারা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ফুটবল থেকে দূরে সরে যায়নি। তারা ভালো ফুটবল দেখতে চায়। কিন্তু মাঠে সেই মানের খেলা না থাকায় দর্শক হারিয়ে যাচ্ছে।
তার মতে, জেলা পর্যায়ের ফুটবল কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। আগে যেখান থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসতেন, এখন সেই পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ছোট দেশগুলো ফুটবলকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করেছে। বাংলাদেশকেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
সমস্যা শুধু খেলোয়াড়ে নয়, ব্যবস্থাপনাতেও
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হলো সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব।
ফুটবলকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু বড় বড় ক্লাব গঠন করলেই হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত যুব উন্নয়ন কার্যক্রম, আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রতিভা তৈরির ধারাবাহিক পরিকল্পনা।
অনেক সময় ক্লাবগুলো বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করে দল তৈরি করলেও বয়সভিত্তিক খেলোয়াড় তৈরি বা ভবিষ্যতের পাইপলাইন তৈরিতে পর্যাপ্ত কাজ করে না।
ফলে কয়েকজন প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে এলেও দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় দলের শক্তি বাড়ছে না।
প্রবাসী ফুটবলারদের আগমনে নতুন আশা
সম্প্রতি বাংলাদেশের ফুটবলে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা তৈরি হয়েছে প্রবাসী ফুটবলারদের আগমনে। ইউরোপীয় ফুটবলের পরিবেশে বেড়ে ওঠা কয়েকজন খেলোয়াড় জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় দর্শকদের আগ্রহও বেড়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কয়েকজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে ফুটবলের ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন পুরো কাঠামোর পরিবর্তন।
বিশ্বকাপের আগে ঘরের ফুটবল শক্ত করতে হবে
ফিফা বিশ্বকাপে দল বাড়লেও বাংলাদেশের জন্য এখনই বিশ্বকাপের স্বপ্ন বাস্তব করার পথ কঠিন। আগে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হবে, এরপর এশিয়ার বড় দলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যেতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার কোনো ঘাটতি নেই। প্রয়োজন শুধু সেই আবেগকে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজে লাগানো।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক অবকাঠামো, নিয়মিত লিগ এবং তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় তৈরির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে আগামী দিনে লাল-সবুজের পতাকাও বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে দেখা যেতে পারে।
নইলে প্রতি চার বছর পর পর অন্য দেশের পতাকা হাতে নিয়েই ফুটবল উৎসবে মেতে থাকতে হবে বাংলাদেশকে।